বিশ্বনবির ঈদ ও কুরবানি

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ঈদুল আজহার দিন আল্লাহর কাছে কুরবানি অ’পেক্ষা অধিক পছন্দের আর কোনো আমল নেই।’

ইসলামের অন্যতম গু'রুত্বপূর্ণ বিধান কুরবানি। কুরবানি ইসলামের অন্যতম শিআর বা ধ'র্মীয় প্রতীক। কুরবানির অর্থ হলো- ‘আল্লাহ তাআলার সন্তষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য শরীয়ত-নির্দেশিত পন্থায় শরীয়ত ক'র্তৃক নির্ধারিত কোনো প্রিয় বস্তু আল্লাহ তাআলার দরবারে পেশ করা এবং শরিয়ত-নির্দেশিত পন্থায় তা ব্যবহার করা।’

এ কুরবানি সুন্নাতে ইবরাহিমির অন্যতম। যা পালনে শর্তহীন আনুগত্যের নির্দেশ দেয় ইসলাম। সুন্নাতে ইবরাহিমি আল্লাহর কাছে এতই পছন্দনীয় হয়েছে যে, এটা সামর'্থ্যবান মুমিন মুসলমানের জন্য পালন করা আবশ্যক। এ কুরবানি শুধু সুন্নাতে ইবরাহিমির স্মর'ণের মধ্যেই শেষ নয় বরং এটি উম্মতে মুহা'ম্মা'দির জন্য অন্যতম ইবাদতও বটে।

ঈদুল আজহা ও কুরবানি মুমিন মুসলমানের জন্য খুশি ও আনন্দের উপলক্ষ। এ দিন হাসি-খুশি থাকা, পাড়া-প্রতিবেশি, আ'ত্মীয়-স্বজন ও গরিব-অসহায়দের মাঝে মেহমানদারি করাও ইবাদতের শামিল। কুরবানির এ উদযাপন বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম আদর্শ। ঈদুল আজহায় বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের নামাজ ও কুরবানি আ'দায় করতেন। হাদিসে বর্ণনায় তা সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে-

– ঈদের দিন নামাজ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির দিন আমা'দের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। তাতে বললেন, আমা'দের এই দিনের প্রথম কাজ ঈদের নামাজ আ'দায় করা। সুতরাং যে এভাবে করবে তার কাজ আমা'দের তরিকা মতো হবে। আর যে আগেই যবেহ করেছে (তার কাজ সঠিক পন্থা অনুযায়ী হয়নি); অতএব তা পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত গোশত, (আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত) কুরবানি নয়।’ (বুখারি)

– বিশ্বনবির নিজ হাতে কুরবানি
ঈদের নামাজের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানি পশু জবেহ করতেন। তিনি নিজ হাতে নিজের পশু জবেহ করতেন।
হজরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘অতপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির স্থানে আসেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি উট নহর (জবেহ) করলেন।’ (মুসলিম)

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ননা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি সাদা-কালো বর্ণের (বড় শিং বিশিষ্ট) নর দুম্বা কুরবানি করেছেন। আমি দেখেছি, তিনি দুম্বা দুটির গর্দানে পা রেখে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বললেন। অতপর নিজ হাতে (তা) জবেহ করলেন।’ (বুখারি)

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ননা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে সাতটি উটকে দাঁড়িয়ে থাকাবস্থায় কুরবানি করেন এবং ম'দিনা থেকে শিংযুক্ত দুটি ধূসর বর্ণের দুম্বা কুরবানি করেন।’ (আবু দাউদ)

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ননা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই শিংওয়ালা ধূসর বর্ণের দু’টি দুম্বা কুরবানি করেন। জবেহ করার সময় তিনি- ‘বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার’ পাঠ করেন এবং তিনি তার পা পশুর ঘাড়ের উপর রাখেন।’ (আবু দাউদ)

হজরত জাবের ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির দিন দু’টি ধূসর বর্ণের শিংবিশিষ্ট ও খাসী করা দুম্বা জবেহ করেন। তিনি দুম্বা দু’টিকে কিবলাহু’মুখী করে শুইয়ে বলেন-
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ بِاسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ : ইন্নি ওয়াঝ্ঝা'হতু ওয়াঝহিয়া লিল্লাজি ফাতিরাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা আলা মিল্লাতি ইবরাহিমা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন; ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহ-ইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বালি আলামিন; লা শারিকা লাহু ওয়া বি-জালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন; আল্লাহু’ম্মা মিনকা ওয়া লাকা আন মুহা'ম্মা'দিন ও উম্মাতিহি বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার।’
অতপর তিনি (পশু) জবেহ করেন।’ (আবু দাউদ)

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির জন্য একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা আনতে বললেন। যার পা কালো, পেটের চামড়া কালো এবং চোখ কালো। দুম্বা আনা হলে নবীজী বললেন, আয়েশা, আমাকে ছু'রি দাও। এরপর বললেন, একটি পাথরে ঘষে ধা'রালো করে দাও। তিনি ধা'রালো করে দিলেন। এরপর তিনি ছু'রি হাতে নিলেন এবং দুম্বাটিকে মাটিতে শোয়ালেন। এরপর বিসমিল্লাহ বলে জ’বাই করলেন এবং বললেন-
اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ بِاسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
হে আল্লাহ! মুহা'ম্মা'দের পক্ষ থেকে, মুহা'ম্মা'দের পরিবারের পক্ষ থেকে এবং মুহা'ম্মা'দের উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করুন।’ (মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ কুরবানির পাশাপাশি নিজ পরিবার ও উম্মতের পক্ষ থেকেও কুরবানি করেছেন। এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের পক্ষ থেকে পশু কুরবানি করেছেন বলেও হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারিতে উঠে এসেছে।

কুরবানির পর প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কুরবানি পশুর গোশত খেতেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়াতেন। কুরবানির গোশত গরিব অসহায়দের সাদকা করার প্রতিও তিনি উদ্বু'দ্ধ করেছেন। হাদিসে এসেছে-
হজরত আবু রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরবানী করতেন, তখন তার গোশত গরিবদেরকে খাওয়াতেন, পরিবারবর্গসহ নিজেও সেখান থেকে খেতেন।’ (বায়হাকি)

হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, (কুরবানির গোশত) তোমর'া নিজেরাও খাও, অন্যদেরকেও খাওয়াও..।’ (মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা নিজ সাহাবীদের মাঝেও কুরবানির পশু বন্টন করলে হজরত উক্ববা রাদিয়াল্লাহু আনহু ও সেখান থেকে একটি পেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি এটা দিয়েই কুরবানি কর।’ (বুখারি)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণে কুরবানি করার এবং কুরবানির গোশত বণ্টনের তাওফিক দান করুন। সঠিক নিয়মে কুরবানির করার তাওফিক দান করুন। আমিন।